কাল বড় ঈদ, মর্জিনার খুশি আর ধরে না। সন্ধ্যার ঠিক আগে, একটা শালিকের বাচ্চা খুঁজে পেয়েছে সে – খেলার মাঠে। তারে আর পায় কে? বাচ্চাশালিকটির পাখনা গজিয়েছে ঠিক, কিন্তু উড়তে শিখে নি। কিছু দূর মাঠের মধ্যে হেঁটে যায় তির তির করে, পাখা ঝাপটায় আর উড়ার চেষ্টা করে। তারপর হাঁপিয়ে উঠে থেমে যায়। মর্জিনা ফের ধরে নিয়ে আসে শালিকের ছানাটিকে। তারপর ছেড়ে দেয় । কিছু দূর যেতেই আবার ধরে আনে। যতবার ধরে আনে তত বার উল্লাসে ফেটে পড়ে সে। হাসির শব্দে মাঠের কোনের নতুন বাড়ীটি থেকে বেরিয়ে আসে আবুল নেতার স্ত্রী , কসে ধমক লাগায়।
– মর্জিনার মা এই মাইয়াডারে লাই দিয়া নষ্ট করতাছে। যা বাড়ীত যা, মাথা খাইস না।
ধমক খেয়ে মিনিট খানিক চুপ করে থাকে মর্জিনা। তারপর আবার খেলা শুরু করে। ‘ কারো জমিত খেলছতাছি নাকি? খেলার মাঠ কারো বাপের জমি না।’
আজানের আগে মুয়াজ্জিন মোসাদ্দেক মাইক ঠিক আছে কিনা দেখে , গোটা দুই ফুঁ দিয়ে। তারপর চিকন গলায় ঘোষণা করে ঈদ মোবারক। যদিও ঈদের মানে মর্জিনা জানে , কিন্তু ঈদ বলার পর সবাই কেন মোবারক চাচার নাম বলে , সেটা সে বুঝে উঠতে পারে না। টিপুরা, সুমনরা মিলে একটা মিছিল বের করেছে- ‘কালকে ভাই ঈদের দিন, ঈদগাহ্ মাঠে যোগ দিন’। মর্জিনা ছেলেগুলোর পেছন পেছন যায়। তাঁর বড় ইচ্ছে হয় মিছিলে যোগ দেয়ার । কিন্তু কোন মেয়ে মিছিলে নাই। তাই মিছিলে যোগ দেয়ার চিন্তা বাদ দেয় সে।
ফের ফিরে আসে মাঠে। আলো কমে এসেছে মাঠের। শালিকের বাচ্চাটিকে এদিক ওদিক খুঁজে, কিন্তু পায় না। ইজ্জত আলীর টং দোকানের সামনে এসে, বিদ্যুতের খুঁটি ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকে। আম্মা এই খানেই দাঁড়িয়ে থাকতে বলছে। “এইহানে দাঁড়াইয়া থাকবি, মাইনষের আনাগোনা আছে এইহানে। বড় হইতাস, বুঝস না। মাইয়া মাইনসেরে অনেক বুইঝা চলতে অয়।” কি বুঝবে, মর্জিনা বুঝে না।
শেখ বাড়ি থেকে কাজ শেষে ফিরলে এক সাথে বাড়ী ফিরবে তারা। কাল ঈদ তাই আজ শেখ বাড়িতে কামের শেষ নাই। মসলা বাটতে হবে । বাসনকোসনও ধুইতে হবে অনেক। দেরী হবে আসতে। শেখ বাড়ির দেমাগী মাইয়া তাহমিনার পুতুল চুরি হয়ে যাওয়ার পর মর্জিনার শেখ বাড়িতে যাওয়া নিষেধ। তবে কাল মনে হয় যেতে পারবে। ঈদের দিন তো, কেউ কিছু বলবে না।
আজ সকালে লুকিয়ে গুড় খেয়েছে বলে আফসোস হয় মর্জিনার । ‘গুড়ের কারণে রক্ত এহন মিঠা। মশাগুলান টের পাইয়া গেছে’। মশা এসে হামলে পড়ে তাঁর পায়ে। সে ইজ্জত আলির দোকানে গিয়ে খালি বেঞ্চিতে বসতে পারে। কিন্তু আম্মা বলছে লোকটা ভাল না। লোকটা কেন ভাল না, তাও মর্জিনার বোঝে আসে না। মর্জিনাকে দেখলেই সে বিস্কুট দিতে চায়। পিঠে হাত দিয়ে আদর করে।
দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে প্রায় ঘুম এসে যায় । অবশেষে মর্জিনার মা আসে। হাতে একটা গামলা। ঘুম কেটে যায় মর্জিনার।
- কি ছালুন দিছে , আম্মা?
- মুরগীর ছালুন।
শেখ বাড়ীর মুরগীর ছালুন খুব মজার। গরম মসলার এমন ঘ্রাণ। গরম মসলার গন্ধে ঘুম কেটে যায় মর্জিনার।
- দেহি আম্মা
- বাড়িত গিয়া দেহিস।
তবু বায়না ধরে মর্জিনা। গামলা নামিয়ে দেখায় তাঁর আম্মা। সাদা ভাত। মুরগীর মাংস এক পাশে। জিভে পানি আসে মর্জিনার। ‘ঠ্যং-এর মাংস কোন দিন দেয় না।’ ঠাং-এর মাংস খাওয়ার ভীষণ শখ মর্জিনার। একটু মন খারাপ হয়।
ঘরে ফিরে মর্জিনার মা, তাঁর কোমরে লুকিয়ে রাখা পলিথিন থেকে একটা লেবু, দু’টো পেঁয়াজ , একটা শসা আর কয়েকটা কাঁচমরিচ বের করে। মর্জিনা জানে তাঁর মা এগুলো তাহমিনার মায়ের চোখের আড়ালে লুকিয়ে এনেছে। এনিয়ে কোন কথা হয় না দু’জনের। লেবু , শসা, পেঁয়াজ কাটা হয়। তারপর মর্জিনার যখন খেতে বসে, তখন মসজিদে এ’শার আযান শোনা যায়। খাওয়া শেষ হলে, কয়টা শক্ত পলিথিন বের করে মর্জিনার মা। মর্জিনা জানে , কেন এগুলো বের করেছে তার মা।
- মাইনষের বাড়িত গিয়া কুরবানীর মাংস টুকাইতে আমার শরম লাগে আম্মা। সবাই যেন কেমন কইরা চাইয়া থাহে।
- তর বাপে মরার সময়, জমিদারী থুইয়া মরছে, না? এতো মান অইলে আমরার চলবো?
মর্জিনার মা রাগ করে । মর্জিনা কিছু আর বলে না।
মর্জিনার আম্মা ট্রাংক খুলে। ট্রাংকের ভেতরে ন্যাপথালিনের গন্ধ। ন্যাপথালিনের গন্ধ মর্জিনার ভীষণ ভালো লাগে। খোলা ট্রাংকের সামনে এসে বসে। মর্জিনার মা জামা বের করে ট্রাংক থেকে। গত বছরের ঈদের জামা। এই বছর ঘরের চালে ছানি দিতে গিয়ে সব টাকা শেষ । ছোট ঈদেও এই জামা পরেছিল মর্জিনা। ‘সবাই দেখেই বুঝবে, এইডা নতুন জামা না’ ভাবতেই কান্না পায় মর্জিনার।
–পইরা দেখ । সব ঠিক আছে নি।
মর্জিনা জামা পরে ভীষণ অবহেলায়। পেছনের দিকে বোতাম লাগাতে গিয়ে তাঁরা টের পায় উপরের দিকের বোতামটা নাই। ট্রাংকের ভেতর মা মেয়েতে মিলে বোতাম খুঁজে । না, নাই ওখানে। ধোঁওয়ার সময় পরে গেছে হয়তো। মর্জিনার মা কোমর থেকে একটা সেফটি পিন খুলে বোতামের জায়গায় লাগিয়ে দেয়।
তারপর জামাটি খুলে আগে জামাটি গায়ে দিয়ে মর্জিনা ঘুমাতে যায়। পাশেই সরিষার ক্ষেত থেকে হাওয়া এসে তাঁদের ঘরে ঢুকে। সর্ষে ফুলের কি মন পাগল করা গন্ধ! ঘুমিয়ে যায় মর্জিনা।
পরদিন ফজরের ওয়াক্তে মোয়াজ্জিন মোসাদ্দেকের আযানে ঘুম ভাঙে মর্জিনার । আজ ঈদ। ভাবতেই, মনের মাঝে একটা সেফটি পিন খচখচিয়ে উঠে।